উৎসর্গ - রিয়াদ এবং বাবর
১
মার্চ মাস ২০০০ সাল, লেভেল ১ টার্ম ১ পরীক্ষার প্রস্তুতি
নিচ্ছি। কোরবানি ঈদ এর দ্বিতীয় দিন
স্কুলবন্ধু রিয়াদ এসে জিজ্ঞেস করল, “টিপুর বাসায় বেড়াতে যাবি নাকি, বরিশাল? লঞ্চে
যাব।” আমি বললাম, “পাগল? সাঁতার জানি না, আব্বু শুনলে আটকাবেই”। ও বলল, “বলার
দরকার কি? বলবি পরীক্ষার প্রিপারেশন নেয়ার জন্য তিন দিন হলে থাকবি। বাবর ও তো
যাচ্ছে।”
এই কথা শুনে একটু নরম হলাম। বাবরের বাসায় যা কড়াকড়ি, ও
যদি যেতে পারে তাহলে আমি নই কেন? জিজ্ঞেস করলাম, “ক্যামনে কি?” আগে কোনদিন
দূরপাল্লার লঞ্চে চড়ি নি, খুব ছোটবেলায় আরিচা ঘাট হয়ে নানাবাড়ি যাবার স্মৃতি আছে,
তেমন সুখকর নয় অবশ্য। ভরা বর্ষায় যেতাম, সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতাম কখন লঞ্চ কাত হয়ে
ডুবে যাবে, এতোই গাদাগাদি ভীড়। রিয়াদ হেসে বলল যে কোন চিন্তা নেই, টিপুর সাথে কথা
বলে সব বন্দোবস্ত করা আছে, শুধু সদরঘাট গিয়ে লঞ্চে উঠতে বাকি।
রিয়াদের কথামত বাসায় ভুজুং দিয়ে সেদিনই বিকালে রওনা
হলাম, পথিমধ্যে বাবর কে বাসা থেকে তুলে নিয়ে জ্যাম ট্যাম পার হয়ে সন্ধ্যা সাড়ে
ছয়টায় লঞ্চঘাটে পৌঁছালাম। বুঝলাম কেন কথায় বলে, উপর দিয়া ফিটফাট ভিতর দিয়া সদরঘাট!
ঘাট অনেক বড় হলেও ঢোকার গেট বেশি চওড়া নয়। নানা রকম লোকে গিজগিজ করে পুরো এলাকা।
খুবই অনুজ্জ্বল টিমটিমে কিছু বাতি জ্বলছে প্রবেশমুখে, সেই আলোতে পরিত্যক্ত
পোড়োবাড়ির মত দেখাচ্ছে দেয়ালগুলো। অবশ্য আলোর দোষ দিয়ে কি লাভ, সূর্যের প্রখর আলোতেও
খুব বেশি হেরফের হতো বলে মনে হয় না। রিয়াদ
জানালো ঈদের পরদিন এসেছি বলে ভীড় নিতান্তই কম, এমনিতে নাকি হাঁটার জায়গা পাওয়া যায়
না ইত্যাদি। যাই হোক, পন্টুনে বিশাল সব লঞ্চ লোহার দড়ি দিয়ে বাঁধা, দেখতে কমবেশি
সুন্দর, ঈদ উপলক্ষে হয়ত নতুন রঙ করা হয়েছে। আরিচা ঘাটে দেখা সেই কাঠের লঞ্চ গুলির
মত নয়, যাকে বলে একেবারে স্টিলবডি। টিপুর দেয়া উপদেশমত সাগর-৭ লঞ্চে উঠলাম, এটাই
নাকি এই লাইন এর সবচেয়ে ভালো নৌযান, ঝড়বৃষ্টিতেও ডুবে যাবার কোন সম্ভাবনা নেই।
যদিও সুরভী-৪ কে দেখে অপেক্ষাকৃত বড়, মজবুত এবং বিলাসবহুল বলে মনে হচ্ছিল, তবুও
এক্সপার্ট অপিনিয়ন বলে কথা, টিপুর জন্ম, ভালোবাসা এবং মৃত্যু (সম্ভাব্য) সবই
বরিশালে, ওর কথার ওপর কথা সাজে না।
লঞ্চের ভেতরটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা, লোকজন চাদর আধাআধি কিংবা
পুরো বিছিয়ে দস্তুরমত বিছানা পেতে জায়গা দখল করে নিয়েছে, দোতলায়ও একি অবস্থা।
তৃতীয় তলায় সব কেবিন এবং সারেং এর ওয়াচরুম, তার উপরে ছাদ। দেখেশুনে কেবিনগুলোর
বাইরে রাখা চেয়ারে বসে গেলাম, সাথে চাদর আনি নি যে নিচে বিছানা পাতবো। অবশ্য চাদর
আনলেও কি, জীবনের প্রথম স্বাধীন নৌকা ভ্রমণ, চারদিক দেখতে দেখতে যাব না সে কি হয়?
রাতজাগা নিয়ে কুছ পরোয়া নেই, কতো রাত টুয়েন্টি নাইন খেলে পার করে দিলাম! ইদানীং
দিনে জেগে থাকাই কষ্টকর, বিশেষ করে ক্লাসে লেকচারের সময়।
সাতটা পাঁচে লঞ্চ ছাড়ল, গতি মসৃণ। বড় নৌযান, কোন দুলুনি
নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই পোস্তগোলা ব্রিজ পেরিয়ে এলাম। শহরের সীমানার এতখানি বাইরে
এই প্রথম আসা। আকাশে মোটামুটি বড় একটা চাঁদ, সেই আলোয় যা দেখি তাই ভালো লাগে, কেমন
যেন স্বপ্ন স্বপ্ন ব্যাপার। নদীর উত্তর
পাড়ে একটু পর পরই আলুর গুদাম (আসলে কোল্ড স্টোরেজ লিখা, মুন্সীগঞ্জে প্রচুর আলু
ফলে কিনা, ধরে নিয়েছিলাম বেশিরভাগে আলুই আছে)। দক্ষিণ তীরের দৃশ্য ভিন্ন, সেখানে একটু
কেবল সারি সারি ইটের ভাটা। এমনিতে ভাটাগুলোকে দেখে আঁতকে উঠি, কারণ সারাক্ষণই সেগুলো
থেকে গাঢ় কালো ধোঁয়া বের হতে থাকে। কিন্তু এখন চাঁদের নরম আলোয় সেগুলোকেও খুব
মায়াবী লাগছে। খুব দ্রুতই দৃশ্যগুলো হারিয়ে যায়, দুই পাশে এখন খাঁটি গ্রাম্য নিসর্গ।
রাতের বেলায় নদীর বুকে নৌকায় করে ঘুরে বেরিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য
দেখতে পাওয়া যায়, এই তথ্যটি যারা জানেন না তাদের জন্য একরাশ সহানুভূতি!
মানব মস্তিষ্কের ট্র্যাজেডি হলো খুব সুন্দর জিনিস বেশিক্ষণ
সহ্য করতে পারে না, এত সুন্দর দৃশ্যও একটু পরে
আমাদের একঘেয়ে লাগতে থাকে। নদীর বুকে কিছুক্ষণ পরে পরে জেলে নৌকার ক্ষীণ
আলো, বিস্তৃত চরাভূমি, বয়া দিয়ে ভাসিয়ে রাখা মাছের ঘের, লঞ্চকে পথ দেখানো সিগনাল
বাতি কিছুই খানিক আগের মতো অপার্থিব মোহ তৈরি করে না, আহা উহু করা শেষ হলে প্রকৃতি
দেখা বাদ দিয়ে আমরা গল্পগুজব শুরু করলাম। রাত দশটার দিকে দেখি বেশ ঠাণ্ডা লাগছে।
ঢাকায় গরম পড়ে গিয়েছে, বাসায় ফুলস্পীডে ফ্যান ছেড়ে ঘুমাই, এমনটা হবে ভাবি নি।
ভাবলাম নিচে যাই, ওখানে নিশ্চয়ই গরম হবে। ঘুরে আসাই সার হলো, নিচে একফোঁটা যায়গা
নেই, যে যার মত ঘুমিয়ে তো আছেই, সিঁড়িতেও লোক বসা। লাভের মাঝে লাভ, ইঞ্জিনরুমের
পাশ দিয়ে আসার সময় জানতে পারলাম, সাগর -৭ এর দুটি ইঞ্জিন এর একটা বিকল, তাই আজকে
অর্ধেক পাওয়ারে লঞ্চ চলছে।
আবার চেয়ারে ফিরে গেলাম এবং ঠাণ্ডা লোহায় হেলান দিয়ে
একটু চোখ বুঁজলাম। বেশিক্ষণ এইভাবে থাকা গেল না, কারণ ঠাণ্ডা বাড়ছেই, আর পাল্লা
দিয়ে বাড়ছে বাতাসের বেগ। অষ্টম শ্রেণীতে ভূগোলে পড়া “রাত্রি বেলায় স্থলভাগ দ্রুত
শীতল হয়ে যায় ফলে শীতল বাতাস স্থলভাগ থেকে জলভাগ এর দিকে প্রবাহিত হয়” কথাটির
ব্যবহারিক দিক হাড়ে মাংসে মজ্জায় টের পেলাম। ছাদে গিয়ে খোলা মেঝেতে শুয়ে পড়লে
রেলিং এ কিছুটা বাতাস আটকাবে মনে করে ওপরে গেলাম, কিন্তু সেখানে নতুন বিপদ, ছাদ
শিশিরে ভেজা এবং আরো কুয়াশা পড়ছে। তাই, ব্যাক টু দা প্যাভিলিয়ন, অর্থাৎ তিন তলার
কেবিনের বাইরের চেয়ার। বাবর বুদ্ধি দিল, “আয় গান গাই, এতে ঠাণ্ডা কম লাগতে পারে”।
আমার কিছুটা আপত্তি ছিল, যদি কেবিনের লোকজন বের হয়ে মার লাগায়? আমাদের যা গানের
গলা! কিন্তু ঠাণ্ডার প্রকোপে সে আপত্তি ধোপে টিকল না, শুরু করলাম। জানা, অর্ধজানা
এবং এক লাইন জানা সব গান গেয়ে শেষ করার পরও কেউ বেরিয়ে আসে নি, আমাদের গলার গুণে
নয়, ঠাণ্ডার কারণে। অথবা অন্য কোন ব্যস্ততায়, পাঠক আন্দাজ করে নিতে পারেন, যেমন
আমরা করেছি!!!
রাত দুটো বাজে, ঠাণ্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছি, বাতাস থেকে
আমাদের রেহাই দেবার জন্যই কিনা, লঞ্চ থেমে গেল। ২য় ইঞ্জিনটাও কি গেল নাকি? রিয়াদ
নিচে গিয়ে খবর আনল, না! ইঞ্জিন ঠিক আছে, তীব্র কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা সীমিত,
তাই আপাতত লঞ্চ চলবে না, কুয়াশা কাটলে তবে। ভাল বিপদে পড়া গেল, টিপুর সাথে কথা হয়ে
আছে, সকাল ছয়টায় লঞ্চ বরিশাল ঘাটে ভেড়ার কথা, সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে ও এসে
আমাদের নিয়ে যাবে। যদি দুঘণ্টাও লেট করি, তাহলেই প্ল্যান এর চৌদ্দটা বেজে যাবে।
রিয়াদ কে জিজ্ঞেস করলাম, টিপু না এলে আমরা নিজেরা পৌঁছাতে পারব না? ঘাটে নেমে একটা
রিকশা নিলেই তো হবে, রিকশাওয়ালা নিশ্চয়ই ঠিকানা চিনে নিয়ে যেতে পারবে? রিয়াদ বলল
“ঘাবড়াতা কিউ হ্যাঁয়? সাব ঠিক হো যায়েগা”। শাহরুখ খানের সে বিশেষ ভক্ত, হিন্দি
ভাষা তার নখদর্পণে। এমনিতে ও খুব সাবধানী ছেলে, নিজে বিপদে পড়তে হয় এমন কিছু সে
কখনো করবে না। কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। আমাকে ঘাবড়ে যেতে দেখেই কিনা, বাবর এক গল্প
শুরু করল। কয়েক বছর আগে ওর কোন চাচাতো ভাই লঞ্চে করে নোয়াখালী যাচ্ছিল, পথিমধ্যে
ডাকাত পড়েছে এবং যাকে পেয়েছে কেটে টুকরো করে ভাসিয়ে দিয়েছে, যারা সাঁতার জানে
তারাই শুধু পানিতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে।
কি ভয়াবহ! আমরা যেভাবে থেমে আছি ডাকাতের আক্রমণ হওয়া
খুবই সম্ভব। আর কেউই তো সাঁতার জানি না, কপালে কি যে আছে.........
২
এতক্ষণ চারিদিক বেশ চুপচাপ ছিল, হঠাৎ করেই কিছু লোকের
কথার আওয়াজ ভেসে আসে এবং ক্রমশ: শব্দ এগিয়ে আসতে থাকে। জোরালো একটি সার্চলাইটের
আলো হঠাৎ একবার জ্বলেই নিভে যায়, কুয়াশা ভেদ করে আবছাভাবে বোঝা যায় একটি লঞ্চ
এগিয়ে আসছে। মোটামুটি সত্তর আশি ফুট দূরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে আমাদের লঞ্চটির
সমান্তরালে অবস্থান নেয়, এই পর্যন্তই। দশ মিনিট পর ডান দিক থেকে আরেকটি লঞ্চ এসে
একই কাজ করে, আরে! ঘিরে ফেলছে নাকি? পনেরো বিশ মিনিট পার হবার পর বুঝতে পারলাম এরা
আমাদের মতোই যাত্রীবাহী লঞ্চ, একসাথে জোট বেঁধে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য।
উত্তেজনা কমে আসলে সময় কাটানো কঠিনতর হয়ে ওঠে, কারণ শীত
আরো বেড়েছে। বেশ ক্ষিধেও পেয়েছে, শেষ খেয়েছি বিকাল পাঁচটায়, এখন রাত তিনটার বেশি।
ক্ষুধা এবং শীতের যৌথ আক্রমণে চেয়ারে বসেই বিচিত্র ভঙ্গীতে ঘুমিয়ে পড়লাম, সম্ভবত
আমরা তিন জনেই। ইঞ্জিন চালু হওয়ার ঝাঁকুনিতে তন্দ্রা কেটে গেল, ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি
পাঁচটা বিশ। এখনো বেশ অন্ধকার, চাঁদ ডুবে গেছে। সার্চলাইট জ্বালিয়ে লঞ্চ চালানো
হচ্ছে, কুয়াশা খুব পাতলা নয়। আস্তে আস্তে আকাশ ফর্সা হয়ে আসতে থাকে, আর মোটামুটি
আলো হবার পর একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলাম, লঞ্চ তীরের সমান্তরালে না চলে
কোনাকুনি চলছে। পানির গভীরতা এই মৌসুমে কম থাকে, কোন ডুবোচরকে পাশ কাটিয়ে যাবার
জন্য কি? নাকি কোন ঘাটে থামতে যাচ্ছে? তীর বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে, প্রশ্নের উত্তর
পাওয়া গেল যখন লঞ্চ এক ইঞ্জিন এর পূর্ণ শক্তি নিয়ে সজোরে পাড়ে আঘাত করল এবং নাকের প্রায়
তিনফুট মত নরম মাটিতে ঢুকে গেল। রেলিং ধরে কোনমতে ধাক্কা সামলালাম। নিচের দুই তলার
অনেক যাত্রীই ওপরে উঠে এলেন কি হল দেখার জন্য, একজনকে দেখে মনে হল সারেং, ঘুমিয়ে
ছিলেন বোধহয়। স্টিয়ারিং দায়িত্বে যে ছিল তারও হয়ত ঘুম পেয়েছিল, হাজার হোক মানুষ
তো?
সারেং এর নির্দেশে ইঞ্জিনম্যান ফুল রিভার্স দিতে থাকে।
কিন্তু বিধি বাম, ভাটার কারণে পানি কমে গিয়ে থাকবে, লঞ্চ খানিকটা প্লবতা হারিয়েছে
এবং পরিশ্রান্ত ইঞ্জিন পুরো দেহটিকে পিছিয়ে আনতে অপারগতা প্রকাশ করছে। আধা ঘণ্টার
মধ্যেই অনেক গ্রামবাসী এসে জড়ো হয়েছে, নেমে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলছে কিছু যাত্রী।
আমরাও নামলাম। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,
ভাই বরিশাল এখান থেকে কতদূর? আন্দাজ পেতে চাচ্ছিলাম আর কত সময় বাকি পৌঁছাতে। ওনার কাছ
থেকে জানলাম, বেশি দূর নয়। এখান থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটলে একটা বাস স্টেশন, সেখান থেকে
বাসে চড়ে বরিশাল যাওয়া যায়। তারপর জিজ্ঞেস করলাম লঞ্চ ছুটতে কতক্ষণ লাগবে বলে তার
মনে হয়? জবাব দিলেন, শেষ যেবার এই চরে লঞ্চ আটকা পড়েছিল সেটা সাত দিন পরে ছুটতে
পেরেছিল। জায়গার নাম গঙ্গাচড়া। গোঁ গোঁ করে তখনো ইঞ্জিন রিভার্সের চেষ্টা করে
যাচ্ছে আর বাবর দেখলাম হতাশায় মাথা নাড়ছে। তিনজন মিটিং বসালাম। এজেন্ডা, “এখন
করণীয় কী?”
রিয়াদের বক্তব্য, শুধু শুধু এখানে বসে থাকার মানে হয় না।
লঞ্চে ওঠার সময় টিকেট কাটতে হয় নি (নেমে যাবার আগে মাল্লাদের কেউ একজন টিকেট হাতে
নিয়ে বসবে, তার কাছ থেকে কাটতে হবে, জনপ্রতি পঞ্চাশ টাকা)। একঘণ্টা হেঁটে যদি বাস
ধরা যায় ব্যাপারটা মন্দ নয়, ভাড়াও হয়ত দেড়শ টাকার কম হবে। এই লঞ্চের প্রতি আমাদের
কোন দায়বদ্ধতা নেই, তারা এক ইঞ্জিন নিয়ে যাত্রা করেই এই বিপত্তি ঘটিয়েছে, কাজেই
ভাড়া না দিয়ে নেমে যাওয়াই উচিত। বাবর অচেনা যায়গায় নেমে হেঁটে যেতে রাজি নয়। আমি কিছুক্ষণ
চিন্তা করে রিয়াদের পক্ষে ভোট দিলাম, সাত দিনের কথা শুনে ভয় পেয়ে গেছি। আমরা
সিদ্ধান্তে আসার আগেই কিছু যাত্রী বোচকা নিয়ে হাঁটা দিয়েছে, স্থানীয়রা যদি এই পথ
ধরতে পারে, নিশ্চয়ই এটা সুবিধাজনক। খানিকটা গাই গুই করে বাবরও সম্মত হল যে লঞ্চ
থেকে নামা যেতে পারে।
বিসমিল্লাহ বলে নেমে পড়লাম, বিপদে পড়লে সৃষ্টিকর্তার স্মরণ
এমনিতেই একটু বেড়ে যায়। এর মধ্যে পানি আরো কিছু কমেছে, লঞ্চ ছাড়া পাবার আশা
নিতান্তই কম বলে মনে হচ্ছে।
মিনিট পনের হাঁটার পরে পথ বেঁকে গিয়ে দৃশ্যটি চোখের
আড়ালে চলে গেল। সকাল পৌনে সাতটা বাজে, গ্রামের লোকজন শুনেছি খুব ভোরে ঘুম থেকে
ওঠে, কাউকে অবশ্য দেখা যাচ্ছে না। আকাশ কিছুটা মেঘলা, সাধারণ নিয়মে মার্চ মাসের
শেষ দিকে বৃষ্টি হবার কথা নয়, রীতি হিসেবে দেখে এসেছি ১লা এপ্রিল বৃষ্টি হয় সবসময়।
তবে নিয়মটা মনে হয় শুধু ঢাকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কারণ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু
হয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। কোথাও আশ্রয় নেবার চেষ্টা করা বৃথা, আমরা বিশাল কতগুলো ফসলের
ক্ষেতের ঠিক মাঝখানের আইল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, নিকটতম গাছটি অন্তত কিলোমিটার খানিক
দূর। একটুপরেই মাঝারি ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে থাকে, অনভ্যস্ত পায়ে পিচ্ছিল মাটির ওপর
দিয়ে হাঁটা বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে, বাটার ভারি রেইনব্রেইনার স্যান্ডালও ভারসাম্য
রাখতে পারছে না। অচেনা লোক দেখে কিছু বাচ্চা ছেলে বেরিয়ে এসেছে, আমাদের সোজা হয়ে
হাঁটার কসরত দেখে হেসেই খুন। রিয়াদ ওদেরকে ভড়কে দেবার জন্য জিজ্ঞেস করল, “ওই,
তোমাদের গ্রামে কি বিএইচএমএইচ আছে”? কথাটি নতুন শেখা, “বড় হইলে মাল হইবে” এর
সংক্ষিপ্ত রূপ। মর্মার্থ, আজ যে কুঁড়ি কাল সে পুষ্প ইত্যাদি। একটি বাচ্চা বলল, “কি
কন? ইচা মাছ?” বাবর হো হো করে হেসে উঠলো এবং তাল হারিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই আছাড় খেলো।
বাচ্চাদের হাসিতে এবার আমরাও যোগ দিলাম, ঈদের নতুন
প্যান্ট, হাঁটু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত কাদায় মাখামাখি হয়ে গিয়েছে। গোমড়া মুখে
উঠে দাঁড়িয়ে বাবর আবার হাঁটা শুরু করে, মিনিট দশ না যেতেই কাদাটে একটা জায়গা পার
হতে গিয়ে স্লিপ কেটে পড়লাম আমি। কপাল খারাপ, বাবর পড়েছিল হাঁটু দিয়ে, আমি পড়লাম
পশ্চাৎদেশের ওপর। শার্টের কিছু অংশ সহ পুরো পেছন দিক গাঢ় ধূসর রঙ ধারণ করল। আমি
অবশ্য সবটা দেখতে পাচ্ছিলাম না, বন্ধুরা বলে দিয়েছিল।
যাই হোক, পূর্বপরিকল্পনা মত পঁয়তাল্লিশ মিনিট হাঁটার পর
পেলাম একটা খাল। মনে হল কৃত্রিম। কারণ চোখের দেখায় মনে হচ্ছিল কিনারায় একটু অংশ
বাদে গভীরতা মোটামুটি সব যায়গায় সমান, পানি অপ্রত্যাশিত রকম স্বচ্ছ বলেই নীচ
পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। পার হবার জন্য একটি বাঁশের সাঁকো দেয়া আছে, একটি বাঁশ পায়ের
জন্য আর একটি হাতের। হাতেরটি সরু হতে হতে একসময় ফুরিয়ে গেছে, শেষ দশ ফুট শুধু পায়ের
বাঁশ, সেটিও পর্যাপ্ত পরিমাণ ভারসহা বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের আগে লঞ্চ থেকে নামা
স্থানীয়দের দলটি আগেই সাঁকো পার হয়ে গিয়েছে, আমরা পার হতে গিয়ে দেখলাম ঘটনা
সুবিধের নয়, তাদের পায়ের লেগে থাকা কাদায় বাঁশগুলো ভেজা এবং পিচ্ছিল। দাঁড়িয়ে থেকে
কোন লাভ নেই, এগিয়ে যেতেই হবে তাই দোয়া দরূদ পড়ে আবার শুরু করলাম। বাবর সবার আগে
নির্বিঘ্নে পার হয়ে গেলো, ব্যালান্স নিয়ে একটুও সমস্যা হলো না। আমার ভয় ভয় করছিল,
কেবলই মনে হচ্ছিল পড়ে যাব, তাই স্যান্ডেল গুলো খুলে পাড়ের দিকে ছুঁড়ে দিলাম, নিজে
পড়লে হাঁচড়ে পাঁচরে উঠতে পারবো হয়ত, ভারী পাদুকাজোড়া সমস্যা করতে পারে। হাত ছেড়ে
দুই পা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এলাম, কাত হয়ে যাচ্ছি, পড়ব নির্ঘাত। একটু ভেবে কিছুটা
পিছিয়ে এলাম, তারপর দিলাম দৌড়, তিনটা বড় স্টেপে খোলা দশ ফুট পার। রিয়াদও একই
পদ্ধতিতে পার হয়ে এলো। আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা ছাড়লাম এতক্ষণে।
কিন্তু বাস কই? ৪৫ মিনিট এর জায়গায় ১ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে,
বাস স্টেশনের দেখা নেই। একটা বাঁক ঘুরে দেখি আমাদের আগের যাত্রীরা জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে
আছে। সামনে বিশাল এক নদী, চওড়ায় সাতশ মিটার মত হবে, তার না আছে খেয়াঘাট, না আছে
নৌকা। অপর পাড়েও কিছু নেই, এর মানে নদীর এই অংশটা দিয়ে কেউ পার হয় না। কিছুক্ষণ
দাঁড়িয়ে থাকার পর এক গ্রামবাসী এসে জানালো যে তার একটি ছোট নৌকা আছে, চাইলে আমরা
সেটা ভাড়া করে পার হতে পারি। আমরা এক মুহুর্তে রাজি, কিন্তু তার নৌকা দেখে মুষড়ে
পড়লাম, আমরা ২৮-৩০ জন এতো ছোট নৌকায় উঠব কেমন করে? দুই বারে পার হওয়া যায়, কিন্তু
কেউ এপারে থাকতে রাজি নয়।
দশে মিলি করি
কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ, উঠে পড়লাম সবার সাথে, কিনারা আর পানির মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ালো
বড়জোর ছয় ইঞ্চি। মাঝি নড়াচড়া করতে একেবারেই নিষেধ করে দিয়েছে, করলেই নৌকা কাত এবং
ঝপাস!
চারশ মিটার মত এগিয়েছে নৌকা এমন সময় আমার সারাজীবনে দেখা
অন্যতম ভারী বর্ষণ শুরু হল। সহযাত্রীরা প্রথমে মৃদু গুঞ্জন এবং তারপরে আতংকিত হয়ে
কোলাহল শুরু করে দিল। আমি অধিক শোকে পাথর, এই সুন্দর জীবনের অনেক কিছুই বোধহয় আর
দেখা হল না। রিয়াদ এতো বিপদেও মাঝির সাথে রসিকতা করে বলল, “ভাই দেইখেন ঠিকঠাক মত
পার করে দিয়েন, এখনো বিয়ে করি নাই, বাসর রাত না দেখে মরতে চাই না”, কয়েকজন হেসে
উঠলো। আমার পাশে বসা এক লোক আমাদের তিনজন কে উদ্দেশ্য করে বলল, “বয় পাইয়েন না,
নৌকা ডুবলে আমি একজনকে তোলতে পারবো”। খুব ভরসা পেলাম এমন নয়, কিন্তু রিয়াদ দেখলাম
আলাপ শুরু করে দিল। আমি অচেনা লোকের সাথে সহজ হতে অনেক সময় নেই, তাই চুপ করে
থাকলাম। ভদ্রলোকের নাম আব্দুস সালাম মাস্টার, ঢাকার মীরপুরে একটা প্রাইমারী স্কুলে
পড়ান।
কপাল ভাল শুধু বৃষ্টিই ছিল, ঝড়ো বাতাস ছিল না। নৌকা একসময়
অগভীর পানিতে পৌঁছাল, এত লোক নিয়ে অবশ্য ডাঙা পর্যন্ত যেতে পারল না, পানির গভীরতা
অনেক কম, চকচকে বালি দেখা যাচ্ছে নীচে। সালাম সাহেবের সাথে দুইটা ব্যাগ এবং পায়ে বুটজুতো
সদৃশ এক ভারী ফিতেওয়ালা জুতো। পড়তে এবং খুলতে অনেক সময় লাগে, খালি পায়ে পানিতে
নামতে গেলে দল থেকে পিছিয়ে পড়বেন এই কথা জানিয়ে অনুরোধ করলেন আমরা তাকে তুলে ধরে
পানির অংশটুকু পার করে দিতে পারি কিনা। একটু আগেই আমাদের কোন একজনের জীবন বাঁচানোর
কথা বলছিলেন, অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাঁধে তুলে পার করে দিলাম আমি আর রিয়াদ।
অগ্রণী জনতার পেছন পেছন গেলাম বহু প্রতীক্ষিত বাস ধরার
আশায়। যা শুনলাম তাতে বিষম খাওয়ার জোগাড়। বাস স্টেশন আছে, বাসও আছে, সেটা নাকি
আবার চলেও। কিন্তু বরিশাল শহরে যায় না, যায় ট্যাঁক নামের একটি নিকটবর্তী স্থানে,
আপ অ্যান্ড ডাউন। কি আপদ! কেনই বা সে আছে আর কেনই বা চলে, এই তিন কিলোমিটার না চষে
বেড়ালে না চললে নিশ্চয়ই কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত না।
সমস্যা গুরুতর আকার ধারণ করল যখন জানা গেল এই এলাকা থেকে
বহির্বিশ্বে যোগাযোগের একমাত্র বাহন ট্রলার এবং দিনের শেষ ট্রিপটি পৌনে আটটায় ছেড়ে
গিয়েছে। বাপের জন্মেও শুনিনি এমন কথা। তাহলে প্রথম ট্রিপ কখন গিয়েছিল? গতকাল রাত
এগারোটায়?
আবারো মিটিং, তবে আমরা নই, বসালো সহযাত্রীরা। এখান থেকে
ট্রলারে করে মূলাদী নামের এক জায়গায় যেতে হবে, তিন ঘণ্টার পথ, তারপর বাসে উঠে
বরিশাল। মূলাদীর নাম হয়ত কেউ কেউ শুনেছেন, নদীপথের দুর্ধর্ষ সব ডাকাত এই অঞ্চলেই
বাস করে বলে কথিত আছে, আমরা যদিও তখন জানতাম না। প্রশ্ন হচ্ছে, যাব কিভাবে? কিছু
মাছ ধরা ট্রলার ডাঙ্গায় শুকোতে দেয়া ছিল, দুই একজন মালিককেও আশেপাশে দেখা যাচ্ছে,
কিন্তু ভাড়ার প্রস্তাবে সবাই অস্বীকৃতি জানালো, কেউ রাজি নয়। বৃদ্ধ এক যাত্রীর ক্রমাগত
অনুনয়ে এবং আরেক যাত্রীর তিনগুণ ভাড়া দেয়ার আশ্বাসে একজনের মন গলল, তবে সে কথায়
কথায় মেজাজ দেখানো শুরু করল।
দ্বিতীয় নৌকা ভ্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছি, দূরে দেখা গেল
নদীর বাঁক ঘুরে বিশাল একটা লঞ্চ এগিয়ে আসছে, দুই চিমনি দেখে সনাক্ত করলাম এটি
সাগর-৭, কারণ ধোঁয়া উঠছে কেবল একটি দিয়ে। জোয়ার এসে গিয়ে থাকবে বা অন্য কিছু, মাটি
থেকে নাক বের করে রওনা করতে পেরেছে। সহযাত্রীদের উন্মত্ত হাত ও কাপড় দোলানো
অগ্রাহ্য করে একবার হর্ণ বাজিয়ে চলে গেল, আরেকটি বাঁকে চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত
আমরা তাকিয়ে রইলাম। রাগে দুঃখে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা হচ্ছিল, কেন যে নামতে
গেলাম!!
৩
ভগ্নহৃদয়ে
ট্রলারে চড়ে বসলাম, এখনো অনেক পথ বাকি। ক্লান্তি এবং অবসাদ ঘিরে ধরে চেপে বসছে,
রিয়াদ এবং সালাম মাস্টারের রঙ্গালাপ অগ্রাহ্য করে চোখে ঘুম নেমে এল। আলাপের বিষয়,
আজকালকার তরুণীরা সব নাকি ফার্মের মুরগীর মত বড় হচ্ছে, ভালোমন্দ খায়, সারাক্ষন
খাঁচার ভিতরে থাকে। বাবর বরাবরের মত নীরব শ্রোতা। প্রচণ্ড রোদে একবার চোখ খুলতে
বাধ্য হলাম, কিন্তু পুরোপুরি জাগতে পারলাম না, আবছাভাবে দেখলাম যাত্রীদের কাছ থেকে
ভাড়া ওঠানো হচ্ছে। কেউ কেউ ভাড়া এখনই দিতে চাচ্ছেন না, ভারপ্রাপ্ত টাকা কালেক্টর
একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে সব টাকা ছুঁড়ে দিলেন নৌকার মাঝামাঝি একটা জায়গায়। কয়েকজন
ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেন, এরা সম্ভবত ইতিমধ্যেই ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। ট্রলার
ঘাটে ফেরার পর বাবর ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙ্গালো, আমাকে ঘুমাতে দিলে পুরো দিনই পার
করে দিতে পারি, একবার ষোল ঘণ্টা একটানা ঘুমিয়েছিলাম।
ট্রলার ঘাট থেকে বাস স্টেশন তিন মিনিটের হাঁটা পথ, না
জানার কারণে ভ্যানগাড়িওয়ালাকে জনপ্রতি পাঁচ টাকা হিসেবে পঁচিশ টাকা দিতে হল,
পাঁচজন মিলে উঠেছিলাম। বাস লক্করমার্কা দেখেও একটু আবেগাপ্লুত হয়ে উঠলাম, মনে হলো
স্বর্গে যাবার রথ দেখছি। ভাবি নি এই দুঃসময় থেকে দ্রুত মুক্তি পাব। ভ্যানগাড়ী
আমাদের পদযাত্রীদের একটু আগে নিয়ে এসেছে, টিকেট কাউন্টার থেকে টিকেট নিয়ে বাসে
উঠলাম। সিট নাম্বার দেয়া আছে, খুঁজে নিয়ে বসলাম চারজন। আমি আর বাবর পেছনের সিটে,
রিয়াদ আর সালাম মাস্টার সামনের দুটোয়। খুব জমজমাট আলাপ চলছে দুইজনে। মাস্টার
গম্ভীর ভঙ্গীতে বলছে, “ভাই, জীবনে কুনুদিন ছেড়ি ইউজ করবেন না, করলে আর ভালো পথে
আইতে পারবেন না।” নিজে ইউজ করেছেন কিনা, এই প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে বললেন, “আর
প্রেম করবেন যাহার সাথে তাহারে বিয়া করবেন না, খাতির থাকে না। এই যে আমারে দেখেন,
এক বছর পর বাড়ি যাইতেআছি, কয়েক বাড়িতে বালোমন্দ রান্ধা হইবে”। লোকটার দিকে একটু
ভাল করে তাকালাম, সাধারণ চেহারা, মিডিয়াম হাইট। গোলগাল মুখ, গায়ের রঙ আমার চেয়ে
দুই পোঁচ ময়লা (আমাদের তিন জনের বর্ণনা দেয়া হয় নি, রিয়াদ ফর্সা এবং দেখতেও ভাল,
বাবরও দেখতে ভাল, রঙ শ্যামলা, আমাকে আম্মু শ্যামলা বলে, বন্ধুরা কালো)। এই লোক
পাঁচ-ছয়টা লদকা লদকি প্রেম করে ফেলেছে? আর প্রেমের দেবী আমার দিকে কবে সুনজর তুলে
তাকাবে সেই আশায় কবে থেকে দিন গুনছি!
এক লোক কাঁধ স্পর্শ করে ডাক দেয়াতে তার দিকে তাকালাম। সে
বলল, “ভাই সিট ছাড়েন। আমনে আমার সিটে বইছেন”। হতেই পারে না, তার টিকেট দেখতে
চাইলাম, নয় নাম্বার দেয়া। আমার টিকেট বের করলাম, সেটাতেও নয় নাম্বার নেয়া। নিশ্চয়ই
কাউন্টারের লোকটির ভুল, নিউজপ্রিন্ট কাগজে বলপয়েন্ট দিয়ে নাম্বার দাগানো, ভুল হতেই
পারে। উঠতে যাচ্ছিলাম তার খোঁজে, মাস্টার থামাল। বলল এখানকার নিয়মই নাকি এই, সিট
নাম্বার দেয়া টিকেট দুই থেকে তিন বার বিক্রি হয়। যে আগে বাসে উঠবে সিট তার, বাকিরা
দাঁড়িয়ে যাবে। অবাক হলাম না তেমন, এর থেকে অনেক বড় বড় নাগরিক দুর্নীতির কথা
সংবাদপত্রে পড়ি, দুরের পাড়াগাঁয়ে ছোটখাটো বিচ্যুতি না থাকলে কেমন হয়ে যায় না
ব্যাপারটা?
বাস চলতে শুরু করেছে, কিন্তু একটু পরেই থেমে গেল। রাস্তা
খুব ভাল নয়, কাঁচা এবং আধপাকা। কিছুক্ষণ আগের ভারি বৃষ্টিতে জায়গায় জায়গায় কাদা
জমেছে, তারই একটাতে বাস আটকে গেল। ড্রাইভার ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, যাত্রী ভাইরা নিচে
নেমে ঠেলা দেন, হেল্পার একা পারব না। সিটে বসা কেউ নড়ল না, জানা কথা ফিরে এসে আর
বসতে পারবে না। গেটের কাছে জটলা পাকিয়ে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তাদেরকে একরকম ঠেলে বের
করে দিল বাস কন্ডাক্টর (প্রতি স্টেশনেই লোক উঠছে নামছে, কন্ডাক্টর তাই একজন আছে)।
ঠেলা ধাক্কায় বাস আবার চলা শুরু করল, এক ঘণ্টার যাত্রায় আরো তিনবার থামতে হলো।
অবশেষে যে যায়গাটায় এসে নামলাম সেটা একটা নদীর তীরে, বেশ জমজমাট বলে মনে হল, অনেক
দোকানপাট দুই দিকেই। যতদূর মনে পড়ছে জায়গার নাম আবুপুর। নদীর পাড় অনেক উঁচু, ঢাল
বেয়ে খানিকটা হেঁটে ট্রলার ঘাট পর্যন্ত নামতে হলো। ঝকঝকে সব ট্রলার, প্রতি পাঁচ
মিনিটে একটি করে ছেড়ে যাচ্ছে। নির্বিঘ্নে অপর পাড়ে পৌঁছালাম। তাড়াহুড়ো করে বাসের
কাছে গেলাম, কতক্ষণের জার্নি ঠিক নেই, দাঁড়িয়ে থাকতে চাই না সিটের টিকেট হাতে
নিয়ে। টিকেট কাটার ফাঁকে বনরুটি আর কলা কিনে নিয়েছি, যেতে যেতে খাব। রাস্তা গিয়েছে
বরিশাল ক্যাডেট কলেজের পাশ দিয়ে, সুন্দর সব দৃশ্য চারপাশে, মিনিট চল্লিশেক পর
বরিশাল শহরের প্রধান বাসস্ট্যান্ডে এসে নামলাম। পৌঁছালাম শেষ পর্যন্ত!!!
রিয়াদ কে বললাম, “ভালয় ভালয় শেষ হল সবকিছু, এবার টিপুর
ঠিকানা বের কর, রিকশা নেই”। রিয়াদ ফ্যাকাসে হেসে বলল যে কোন ঠিকানা সে নেয় নি,
কারণ প্ল্যান ছিল টিপু লঞ্চ ঘাটে এসে নিয়ে যাবে। আমি মহাখাপ্পা হয়ে ওকে এই মারি তো
সেই মারি, ঠিকানা না নিয়ে কোন আক্কেলে এত দুরের পথ রওনা হয়েছিস হারামজাদা? রিয়াদ
গা বাঁচিয়ে বলল, কোন চিন্তা নেই, টিপু বলেছে বিএম কলেজের গেটে গিয়ে ওর নাম বললেই
বাসা দেখিয়ে দেবে, পাশেই নাকি বাসা। তাছাড়া ওরা বিরাট একটা গ্রুপ গেটের উল্টোদিকে
আড্ডা দিত সবসময়। প্রায় সব লোকই ওদের চেনে। রিকশা নিলাম বিএম কলেজের। ঈদ বলে গেট
বন্ধ, অনেকক্ষণ ধাক্কানোর পর দারোয়ান গেট খুলল এবং খুবই বিরক্ত মুখে জানালো টিপু
নামে সে কাউকে চেনে না। টিপু বেশ কিছুদিন হল ঢাকায় আছে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি
পরীক্ষা এবং অনার্সে পড়ার কারণে, দারোয়ানটিও অল্পবয়স্ক। ধরে নিলাম সে নতুন জয়েন
করেছে এবং পুরানো পাপীদের চেনে না। রিয়াদ তারপরও জিজ্ঞেস করল যোশেন, তুর্যি, নোমান
এই নামে কাউকে সে চেনে কিনা, এরা টিপুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নাহ!
কলেজের আরো কোন গেট আছে? বাবর জানতে চাইল, হতে পারে
টিপুর বাসা ওখানে। ভালো আইডিয়া, এটা চিন্তা করি নি। জানা গেল গেট আরেকটা আছে বটে,
অল্প দুরেই। গেলাম, যাকে পেলাম ধরে ধরে জিজ্ঞেস করলাম এবং যথারীতি কেউ চিনতে পারল
না। এখানে কতগুলো মুদি দোকান, কনফেকশনারি আর চুল কাটার দোকান আছে। একটা জায়গা
থেকেও কিছু উদ্ধার করা গেল না।
হতাশ হয়ে কি করা যায় ভাবছি। এত সহজে হাল ছেড়ে দেয়া কি
ঠিক হবে? কিন্তু কোথা থেকে শুরু করব আবার? আমার মতে, কেউ যদি জানে তবে সে হচ্ছে
গিয়ে ঐ নরসুন্দর। তার দোকানে সব ধরণের লোকই আসে। একটা সূত্রও কি সে দিতে পারবে না?
কিছুক্ষণ জেরা করার পর সে ‘শহীদ ভাই’য়ের সেলুনে যেতে বলল। ওইটাতে ছাত্ররা বেশি
যায়। গেলাম সেখানে। কিছুক্ষণ আলাপ করার পর জানা গেল সে নোমানকে চেনে। গুডবয়।
ঠিকানা নিয়ে রিকশা করে গেলাম। চৌধুরীপাড়া বলে একটা ছিমছাম যায়গায় বাসা, আমাদের
তুলনায় একটু বয়স্ক একজন লোক দরজা খুললেন।
- কাকে চাই?
- জ্বি, নোমান বাসায় আছে? আমরা ঢাকা থেকে এসেছি, নোমানের
বন্ধু।
- ও আচ্ছা। এসো, ভেতরে এসো, আমি নোমানের বড় ভাই।
- নোমানকে একটু ডেকে দেবেন? আমরা আসলে বসতে আসি নি,
আমাদেরকে আরেকটা জায়গায় যেতে হবে।
- (একটু অবাক) নোমান তো নেই।
- জ্বি, কোথায় গেছে? আমাদের একটু জরুরী দরকার ছিলো.........
- নোমান তো মারা গেছে
রিয়াদ ভীষণ অবাক
হয়ে জিজ্ঞেস করল, কিভাবে? কবে?
নোমানের ভাই
বললেন, এইতো গত দশ তারিখে। রিয়াদ বলল, হতেই পারে না, আমি শেষ তের তারিখে ওর সাথে
কথা বলেছি। ভদ্রলোক বেশ বিরক্ত হয়ে বললেন, তাহলে এই নোমান সেই নোমান নয়। আমরা
একেবারে ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেলাম। সূত্র তো গেলই, ওই ভদ্রলোকের কথা মনে করেও
খারাপ লাগছিলো। মাত্রই ভাতৃহারা হয়েছেন, বেচারা!
রিকশা নিয়ে আবার
সেলুনেই ফেরত এলাম। আরও তথ্য দরকার। অনেক বর্ণনা দেয়ার পরে আরেকজনকে চিনতে পারলেন
সেলুনমালিক। এখন আর ছেলেটার নাম মনে পড়ছে না। যাই হোক, সেখানে গিয়ে শুনি সে
গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেছে। আমাদের কপাল! শুধু ঢাকার মানুষই ঈদে গ্রামের বাড়ি যেতে
পারবে এটা নিশ্চয়ই কেউ দিব্যি দেয় নি, শুধু শুধু উষ্মা প্রকাশ করে লাভ কি?
দুপুর সাড়ে তিনটা
বাজে, শেষবার পেট ভরে খেয়েছি বাসায়। এতোগুলো বিচিত্র জার্নি করে সবার চেহারা হয়েছে
দেখার মতো। ভাবলাম, এবার ক্ষ্যামা দিই। আর খুঁজে কাজ নেই বাপু টিপুর বাসা। ঘরের
ছেলে ঘরে ফিরে যাই। বাকি দুজনও দেখলাম রাজি। বাবর অনেক আগেই ত্যাক্ত হয়ে উঠেছিলো,
ঝুলে ছিলাম শুধু আমি আর রিয়াদ। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার পর বেশ ভালো লাগতে থাকে।
প্রশ্ন হলো, সোজা লঞ্চঘাটে ফেরত যাব নাকি ঘুরেফিরে শহরটা একটু দেখে নেব? হাজার হোক
এত দূর থেকে এসেছি। রিয়াদ রিকশা খুঁজতে এগিয়ে গেল একটু। এলোমেলো ভাবে এদিক ওদিক
চোখ ঘুরাতে গিয়ে দেখি অনেক দূর দিয়ে নেচে নেচে কে যেন হেঁটে চলেছে। কোমর দুলিয়ে
এরকম হাঁটতে পারে শুধু র্যাম্পের মেয়ে মডেলগুলো, আর পারে টিপু।
টিপুউউউ! গলার
সবটুকু জোর একত্র করে ডাক দিলাম, স্কুল জীবনে বয়স্কাউটে যোগ দেবার কারণে মাঝে
মাঝেই কমান্ড দিতে হতো, প্র্যাকটিসটা বুঝি কাজে লাগল! কোন লাভ হলো না, ঝাপসা মূর্তিটা
হেলে দুলে একটা গলির ভেতর ঢুকে গেল। জীবনে এই প্রথম জানলাম জোরে চিৎকার দিলে পেটের
পেশিতে ক্র্যাম্প ধরে যায়, তীব্র যন্ত্রণায় পেট চেপে রাস্তায় বসে পড়লাম।
পাক্কা বিশ
সেকেন্ড পর গলি থেকে মুখ বের করলেন আমাদের আরাধ্য টিপু বাবাজী, বিএম কলেজের
দারোয়ান থেকে শুরু করে
আশে পাশের সবাই যাকে এক নামে চেনে। ওর নাকি মনে হয়েছিল কেউ ডাকছে, কিন্তু এতই
হালকা ছিলো সেই আওয়াজ যে সেটাকে ইগনোর করে ঢুকে যাচ্ছিলো বাসায়। কি মনে করে আবার
বেরিয়ে এসেছে। এতক্ষণ প্ল্যান করছিলাম টিপুকে ঢাকায় পেলে আচ্ছা করে ধোলাই দেব,
কিন্তু এখন মনে হলো কুম্ভের মেলায় হারিয়ে যাওয়া ভাইকে ফেরত পেয়েছি অনেক যুগের পরে,
সহাস্যে কোলাকুলি সেরে নিলাম সবাই।
খুব ছোটবেলায় একবার স্মরণীয় বাণী পড়েছিলাম, প্রত্যেকটি
দুঃখজনক অভিজ্ঞতাই এক একটি শিক্ষা। এই গল্পটা বোকামী দিয়ে ভরা হলেও দুঃখজনক নয়
মোটেই। তবে শিক্ষা পেয়েছি, কারো হামবড়া গল্পে বিশ্বাস করতে নেই।